করোনা পরীক্ষায় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সংকট চরমে

করোনা পরীক্ষায় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সংকট চরমে
দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষার চাপ। হাসপাতালগুলোতে করোনা পরীক্ষার জন্য প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে রোগীদের লম্বা লাইন। নমুনা সংগ্রহে বিলম্ব, পরীক্ষায় বিলম্ব ও ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে।
চিকিৎসকরা জানান, করোনা রোগীর দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এতে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন। এই দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংকট এখন সারাদেশেই চরম আকার ধারণ করেছে। ল্যাবরেটরিতে কর্মীরা টানা কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় শনাক্তকরণ পরীক্ষার ওপর।
কিন্তু যে হারে করোনা রোগী বাড়ছে সে হারে বাড়ছে না পরীক্ষার সুযোগ ও সুবিধা। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ ক্ষেত্রে কর্মী ও জনবল সংকট কাটিয়ে ওঠার জোর তাগিদ দিচ্ছেন। তাদের মতে, আগামী দিনে আরো ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। সেক্ষেত্রে করোনা পরীক্ষার সুবিধা ও সুযোগ বাড়াতে হবে। চিকিৎসক ও নার্সের পাশাপাশি বাড়াতে হবে ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্ট এবং তা জরুরি ভিত্তিতে।
রসায়নাগারের কর্মীদের নিয়মিত অনলাইনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা দক্ষ হয়ে ওঠেন এবং জাতির এই সংকটে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মেডিকেল ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টরা জানান, করোনা আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা এবং পরে তা পরীক্ষা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কাজটি করতে হয় মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদেরই। সরকারি হাসপাতালগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রয়েছেন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ৪ হাজার ২০০ পদের বিপরীতে আছেন মাত্র দেড় হাজার জন।
বাংলাদেশে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মো. আশিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কারণ একটাই; আর তা হলো, টেকনোলজিস্ট একেবারেই কম। তড়িঘড়ি করে টেকনোলজিস্ট নিয়োগ করাও সম্ভব নয়। আবার রাতারাতি এই টেকনোলজিস্ট তৈরি করাও সম্ভব নয়। তারপরও প্যারামেডিকেল থেকে পাশ করে যারা বেকার আছেন তাদেরকে আপদকালীন বা স্থায়ীভাবে নিয়োগের কোন উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ বলেন, ‘সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমাদের টেস্টিং ক্যাপাসিটি আছে ৫ হাজার। কিন্তু আমরা তো ৩ হাজারও করতে পারছি না। এর কারণ হচ্ছে আমাদের দক্ষ জনবলের সংকট। এ মুহূর্তে বেশি বেশি পরীক্ষার বিকল্প নেই। অনেক টেকনোলজিস্ট পাস করে বসে আছেন। চুক্তিভিত্তিক হলেও তাদের নিয়োগ দিতে হবে। শুধু তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে মাঠে নামাতে হবে।
কয়েকদিন আগে দেখা গেছে, খুলনা মেডিক্যাল কলেজে বসানো ল্যাবে পাঠানো নমুনা বাতিল হয়েছে। নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতিতে ত্রুটি ছিল বলে জানিয়েছে ল্যাব কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে ডা. জাহিদ বলেন, তাদের ঠিকমতো প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে এ বিড়ম্বনা হতো না।
দিন দিন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, করোনায় রোগীদের চিকিৎসার বেলায় বয়সে প্রবীণ চিকিৎসকের কথা চিন্তা করা যাবে না।
কারণ, করোনা ঝুঁকির বেলায় বয়সও একটা বড় বিষয়। অনেকের ডায়াবেটিস বা অন্যান্য রোগও আছে। সেক্ষেত্রে করোনার চিকিৎসায় তরুণ ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কথা চিন্তা করতে হবে।
বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএনএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট নিবন্ধিত নার্স ৭৩ হাজার ৯১০ জন। তাদের মধ্যে সরকারি চাকরিতে আছেন ৩২ হাজার ৫৮৫ জন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬ হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সেবা দিচ্ছেন প্রায় ৪০ হাজার নার্স। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদ- অনুযায়ী, নার্সের ঘাটতি আছে। বর্তমানে দেশে বেকার আছেন ৩০ হাজারের বেশি নার্স।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে, আইসোলেশনে থাকা প্রতি পাঁচজন রোগীর জন্য ছয়জন স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে তা নেই। এতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছি চিকিৎসক দেওয়ার জন্য। নতুন চিকিৎসক যারা, তাদেরও দিচ্ছি। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের নিয়েও ভাবা হচ্ছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *